Skip to main content

নারীবাদীতা ও ইসলাম

 আমার স্ত্রীর সাথে পরিচয় ভার্সিটিতে। আমরা দুজনেই তখন হার্ভার্ডে পড়ি। নিজেদের আমরা তখন নারীবাদী ভাবতাম। এর কারণ ছিল। নারীর ওপর পারিবারিক সহিংসতা আর নির্যাতনের প্রভাব কেমন হতে পারে তা নিয়ে দুজনেরই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল। কোনো নারী ঘরের ভেতরে শারীরিক কিংবা মানসিক নির্যাতনের শিকার হোক, এটা আমরা চাইতাম না। নির্যাতনের হাত থেকে নারীদের বাঁচানোর একটা শক্ত ইচ্ছা আমাদের মধ্যে কাজ করত।

.

আমরা মনে করতাম, এমন এক পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য আমাদের কাজ করতে হবে যেখানে নারী যথাযথ শ্রদ্ধা, মমতা, সম্মান, ভালোবাসা এবং সহায়তা নিয়ে বাঁচতে পারবে। তার যথাযথ অধিকার পাবে। এখনো আমরা এটা বিশ্বাস করি। তখন মনে হতো, আমাদের কাঙ্ক্ষিত পৃথিবী পাবার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নারীবাদ। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে উপলব্ধি করলাম নারীবাদ আসলে সমাধান না। নারীবাদ বরং আরও বড় এক সমস্যার অংশ। 

.

নারীবাদী দর্শনের মধ্যে মারাত্মক রকমের সমস্যা আছে। নারীবাদের ধারাগুলোর মধ্যে এক বা দুটো ধারা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক– ব্যাপারটা এমন না; বরং নারীবাদের সূচনাই হয়েছিল ধর্ম-বিরোধী আন্দোলন হিসেবে। বিশ্বাস না হলে ইতিহাসের সবচেয়ে নামিদামি নারীবাদী তাত্ত্বিকদের লেখা পড়ে দেখুন। নারীবাদের প্রথম পর্যায় থেকে শুরু করে তৃতীয় পর্যায় [১] –সবক্ষেত্রে একই উপসংহারে পৌঁছাতে বাধ্য হবেন। 

.

নারীবাদের এই দিকটা আমাদের মুসলিমের বোঝা দরকার। আজ অনেক মুসলিম নিজেকে নারীবাদী মনে করে, বা নারীবাদী বলে পরিচয় দেয়। একসময় আমি নিজে যে কারণে নারীবাদের চিন্তা গ্রহণ করেছিলাম, সেই একই কারণে অন্য আরও অনেক মুসলিমও এই চিন্তা গ্রহণ করেছে। কিন্তু এ প্রবণতা বিপজ্জনক। নারীবাদ তার মধ্যে এমন অনেক কিছু ধারণ করে, যা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক এবং ঈমানকে হুমকির মুখে ফেলে।

.

ইসলামের সাথে নারীবাদের সাংঘর্ষিকতার কিছু দিক বাইরে থেকে বোঝা যায়। আবার কিছু সাংঘর্ষিকতা এমন, যার প্রকৃত মাত্রা অনুধাবন করতে হলে আরও গভীরে ঢুকতে হয়। এ সংঘর্ষ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অবশ্যই জরুরি, তবে সেই লম্বা আলোচনায় যাওয়া ছাড়াও নারীবাদের হুমকির বাস্তবতা বোঝার একটা সহজ উপায় আছে। গাছের পরিচয় পাওয়া যায় তার ফল থেকে, নারীবাদের বাস্তবতা বোঝা যাবে নারীবাদীদের দিকে তাকালে। 

.

নারীবাদীদের বিশাল একটা অংশ কেন ইসলামবিদ্বেষী? নারীবাদে দীক্ষিত হবার পর কেন অনেক মুসলিম ইসলাম ত্যাগ করে? 

.

পরিসংখ্যান:

এ ব্যাপারে পরিসংখ্যান পরিষ্কার। জনসংখ্যার বাকি অংশের তুলনায় নারীবাদী বলে পরিচয় দেয়া নারীদের মধ্যে ধর্মে বিশ্বাসীর সংখ্যা অনেক কম [২]। পশ্চিমা বিশ্বে প্রতি ১০ জন নারীর ৭ জন কোনো-না-কোনো ধর্ম (খ্রিষ্টধর্ম, ইহুদীধর্ম, ইসলাম) অনুসরণ করে। কিন্তু নারীবাদীদের প্রতি ১০ জনে ধর্মে বিশ্বাসী হয় মাত্র ১ জন [৩]।  

.

পাঠক হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, এটুকু তথ্য থেকেই কি এটা প্রমাণিত হয় যে নারীবাদের কারণে মানুষ অবিশ্বাসী হয়? আসুন আরও কিছু তথ্য দেখা যাক। 

.

পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৯৩ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত দুই দশকে, ধর্মহীন (non-religious) নারীর সংখ্যা অ্যামেরিকাতে তিন গুণ হয়েছে [৪]। এ ২০ বছরে সার্বিকভাবেই অ্যামেরিকাতে ধর্মহীন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু কৌতূহলের ব্যাপারটা হলো ধর্মহীনতা বৃদ্ধির এই হার নারীদের মধ্যে অনেক বেশি। ১৯৯৩ এ নাস্তিক এবং অজ্ঞেয়বাদীদের ১৬% ছিল নারী। ২০১৩ তে সেটা বেড়ে হয়েছে ৪৩% [৫]। প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি। নারীদের মধ্যে ধর্মহীনতা এভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ার কারণ কী? 

.

বিশ্লেষকদের মতে এর কারণ হলো গণমাধ্যম, ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নারীবাদী এবং সেক্যুলার আদর্শের বিস্তার। পশ্চিমে থাকা মুসলিমদের মধ্যেও আমরা এ প্রবণতা দেখেছি। আজকালকার মুরতাদরা (ইসলাম ত্যাগ করা নারী ও পুরুষ) তাদের রিদ্দা বা ধর্মত্যাগ নিয়ে অনেক লেখালেখি করে। কোন কারণে তারা ইসলাম ছেড়ে গেছে সেটা জানার জন্য কোনো অনুমানের ওপর নির্ভর করতে হয় না [৬]। আর তাদের লেখাতে বারবার যে কথা উঠে আসে তা হলো, তারা বিশ্বাস করে—ইসলাম, কুরআন এবং নবী পুরুষতন্ত্র, অত্যাচার আর নিপীড়নের অনুমোদন দেয়। 

অর্থাৎ তারা ইসলাম ত্যাগ করেছে, কারণ ইসলাম নারীবাদী না। 

.

প্রতিক্রিয়া:

তবে আজকাল এমন অনেক মানুষ পাওয়া যায় যারা একই সাথে নিজেদের মুসলিম এবং নারীবাদী বলে দাবি করে। নারীবাদ মানুষকে রিদ্দার দিকে নিয়ে যায়, এটা তারা মানতে নারাজ। এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করে নিই। নিজেদের মুসলিম নারীবাদী মনে করা সবাই একসময় মুরতাদ হয়ে যাবে, এটা আমি বলছি না। তবে আমাদের মাথায় রাখা উচিত হাঙ্গর ভরা নদীতে কিছু মানুষকে ফেলে দিলে সবাই মারা যাবে না। কেউ কেউ বেঁচে যাবে। কিন্তু তার মানে এই না যে হাঙ্গর নদীতে মানুষকে সাঁতরাতে বলা বুদ্ধিমানের কাজ। খুব চৌকশ সাঁতারু হয়তো ক্ষত-বিক্ষত দেহে জান নিয়ে পালিয়ে আসতে পারবে, কিন্তু বাকিরা হাঙ্গরের পেটে যাবে। 

.

ঠিক একইভাবে নারীবাদ দ্বারা প্রভাবিত মুসলিমদের বিশাল একটা অংশ প্রকাশ্য কিংবা গোপনে ইসলাম ত্যাগ করে অথবা ইসলামের সাথে চরমভাবে সাংঘর্ষিক বিশ্বাস লালন করে–এটাই বাস্তবতা। তাই আমাদের ঈমান এবং বিশেষ করে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ঈমানকে বাঁচাতে হলে নারীবাদের হুমকি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

.

যেকোনো সমস্যা সমাধানের প্রথম ধাপ হলো, সমস্যার অস্তিত্ব স্বীকার করা। দুঃখজনকভাবে এ জায়গাটাতেই আমরা হোঁচট খাচ্ছি। আমিসহ আরও অনেকে হতাশার সাথে লক্ষ করেছি–নারীবাদ আমাদের ঈমানের জন্য ক্ষতিকর এবং হুমকি–পশ্চিমে থাকা, বিশেষ করে অ্যামেরিকায় বসবাস করা মুসলিমরা এ ব্যাপারটা স্বীকারই করতে চান না। 

.

কেন?

.

এই ‘কেন’-এর জবাব দেয়া অস্বস্তিকর, অসুবিধাজনক। এর আছে নানান রকমের প্রতিক্রিয়া। কারও বক্তব্য নারীবাদের বেঁধে দেয়া সীমার বাইরে গেলেই সামাজিক-রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্টদের দল তার ওপর হামলে পড়ে। কিন্তু যতই অস্বস্তিকর হোক না কেন সত্যকে তুলে ধরতে হবে। সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলা আলিম, ইমাম এবং দা’ঈদের দায়িত্ব। তা নাহলে আমাদের অনেক চড়া মূল্য দিতে হবে। এটা আজ আমরা বুঝতে পারছি না, কিন্তু আজ থেকে ৫/১০ বছর পর আজকের নিস্ক্রিয়তার কথা চিন্তা করে আমরা হয়তো আফসোস করব। কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে যাবে অনেক।

.

এ লেখায় আমার উদ্দেশ্য হলো নারীবাদ কীভাবে ধাপে ধাপে একজন মুসলিমকে রিদ্দার দিকে নিয়ে যায়, তা তুলে ধরা। আমি আশা করি এ বিষয়টা স্পষ্ট হলে মুসলিমরা বাস্তবতা উপলব্ধি করবে এবং নারীবাদের বিরুদ্ধে নীরবতা ভাঙবে। 

.

তাহলে রিদ্দার পথে একজন মুসলিম ফেমিনিস্টের যাত্রার কথা শোনা যাক।


(ইন শা আল্লাহ চলবে...)

#সংশয়বাদী

Comments

Popular posts from this blog

যাকাতুল ফিতর (ফিতরা) হিসেবে টাকা দেয়া সুন্নত না কি খাদ্যদ্রব্য?

হাদীসে ফিতরা হিসেবে খাদ্যদ্রব্য প্রদানের কথাই বর্ণিত হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে দিনার-দিরহামের প্রচলন ছিল কিন্তু তারা কখনো খাদ্যদ্রব্য ছাড়া দিনার-দিরহাম বা অন্য কিছু দ্বারা ফিতরা প্রদান করেছেন বলে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। কি কি জিনিস দ্বারা এবং কত পরিমাণ ফিতরা দেওয়া সুন্নত? এর উত্তর সহীহ হাদীসে স্পষ্ট বর্ণিত হয়েছে যার, ফল কথা হল: খেজুর, যব, কিশমিশ, পনীর কিংবা প্রধান খাদ্য দ্রব্য দ্বারা ফিতরা দেওয়া সুন্নত, মূল্য দ্বারা নয়। আর এক জন ব্যক্তিকে এক সা’ ফিতরা দিতে হবে, যার পরিমাণ সাধারণ মানুষের চার পূর্ণ অঞ্জলি সমান। [ফাতাওয়া মাসায়েল, মাওলানা কাফী, পৃঃ ১৭২-১৭৩] কেজির ওজনে তা আড়াই কিলোর কম নয়। ▪ইবনে উমার (রাযি:) হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন: ‘‘ আল্লাহর রাসূল যাকাতুল ফিতর স্বরূপ এক ’সা কিংবা এক ’সা যব ফরয করেছেন মুসলিম দাস, স্বাধীন ব্যক্তি, পুরুষ ও নারী এবং ছোট ও বড়র প্রতি। আর তা লোকদের নামাযে বের হওয়ার পূর্বে আদায় করে দিতে আদেশ করেছেন”। [ বুখারী, অধ্যায়: যাকাত হাদীস নং ১৫০৩/ মুসলিম নং ২২৭৫] উক্ত হাদীসে দুটি খাদ্য দ্রব্যের নাম পাওয়া গেল যা, দ্বা...

মন ভাঙ্গা আর মসজিদ ভাঙ্গা সমান" এটা কি হাদিসের কথা?

"মন ভাঙ্গা আর মসজিদ ভাঙ্গার সমান কথা" এটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস নয় বরং লোকসমাজে প্রচলিত একটি উক্তি মাত্র। আমাদের সমাজে এ কথাটি মুখেমুখে প্রচলিত রয়েছে এবং শিল্পীরা গানের মধ্যে এ জাতীয় কথা বলে থাকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি হাদিসের বক্তব্য নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে কাউকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দেয়া, কারো মনে আঘাত করা, কারো সাথে প্রতারণা করা, অঙ্গিকার ভঙ্গ করা, গালি দেয়া, মিথ্যাচার করা ইত্যাদি অত্যন্ত জঘন্য গুনাহের কাজ- তাতে কোন সন্দেহ নাই। তবে উক্ত কথাটিকে হাদিস মনে করা বৈধ নয়। কেননা তা কোনো হাদিসের কিতাবে পাওয়া যায় না। 🌀  মুমিনদেরকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দেয়া মারাত্মাক অন্যায় ও কবিরা গুনাহ (বড় পাপ)। এ বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহর কতিপয় বক্তব্য উপস্থাপন করা হল: ❐ আল্লাহ তাআলা বলেন: وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَات ِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا "যারা বিনা অপরাধে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।" (সূরা আহযাব: ৮৫) ❐ আব্দুল্লাহ বিন উমর (রাযিয়...
নারীদের ক্যারিয়ার গঠনে ​ইসলাম কি বাধা দেয়?​ ▬▬▬ 🌐 💠 🌐 ▬▬▬  কখনো নারীদেরকে উন্নত ক্যারিয়ার গঠনে বাধা দেয় না বরং এতে উৎসাহিত করে। তবে অবশ্যই তাকে ইসলামের বিধান মেনে তা করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে যদি ইসলামের বিধান লঙ্ঘিত হয় তখন অবশ্যই ইসলাম অগ্রাধিকার পাবে। এটাই ঈমানের দাবী। এ কথা নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। একজন পুরুষের জন্যও বিধান হল, ক্যারিয়ার গঠন করতে গিয়ে যদি আল্লাহর আইন লঙ্ঘন করতে হয় তখন তাকেও সে পথে থেকে ফিরে আসতে হবে। কেননা, মুমিনের জন্য দুনিয়ার আয়-উন্নতি, সাফল্য ও সমৃদ্ধির চেয়ে আখিরাতের সাফল্য ও মুক্তি বেশী গুরুত্বপূর্ণ।  তাই, যতক্ষণ পর্যন্ত শরীয়তের সীমা-রেখার মধ্যে থেকে ক্যারিয়ার গঠন, চাকুরী, ব্যবসা ও অন্যান্য দুনিয়াবি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করা যায় ততক্ষণ তাতে ইসলাম কোনভাবেই বাধা দেয় না। সুতরাং একজন নারীও ইচ্ছা করলে নারী অঙ্গনে বা এমন পরিবেশে নিজেকে উন্নত করার যাবতীয় উপায় অবলম্বন করতে পারে যেখানে তার সম্ভ্রম ও ঈমান রক্ষা করা সম্ভব হয়। যেমন, বর্তমানে সউদী আরবে আল হামদুলিল্লাহ নারীরা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ব্যাংকিং, আইটি সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরুষের সংমিশ্রণ ছাড়া...